ধ্বনিতত্ত্ব (Phonology)
সংজ্ঞা, শ্রেণিবিভাগ, উচ্চারণ-প্রত্যঙ্গ ও ধ্বনির পরিবর্তন (বাংলা ভাষার প্রেক্ষিতে)
ধ্বনিতত্ত্বের সংজ্ঞা ও গুরুত্ব
ভাষায় ব্যবহৃত সকল ধ্বনির আলোচনা, ব্যবহারবিন্যাস ও উচ্চারণ-বিশ্লেষণকে ধ্বনিতত্ত্ব (Phonology) বলে। ভাষা ও বাংলা ব্যাকরণের আলোচ্য বিষয়ের মধ্যে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা।
বাংলা ভাষার মৌলিক ধ্বনি
কোনো ভাষার বাক্-প্রবাহকে সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করলে কিছু মৌলিক ধ্বনি পাওয়া যায়। বাংলা ভাষার মৌলিক ধ্বনি প্রধানত দুই ভাগ:
- স্বরধ্বনি: উচ্চারণের সময় বাতাস মুখবিবরে বাধাহীন—যেমন: অ, আ, ই, উ ইত্যাদি।
- ব্যঞ্জনধ্বনি: উচ্চারণে কোনো না কোনো স্থানে বাধা/ঘর্ষণ ঘটে—যেমন: ক, চ, ট, ত, প ইত্যাদি।
বর্ণ, বর্ণমালা ও রূপ
বর্ণের সংজ্ঞা
বর্ণ হলো ধ্বনি-নির্দেশক লিখিত চিহ্ন।
- স্বরবর্ণ: স্বরধ্বনি দ্যোতক চিহ্ন—অ, আ, ই, উ ইত্যাদি।
- ব্যঞ্জনবর্ণ: ব্যঞ্জনধ্বনি দ্যোতক চিহ্ন—ক, খ, গ, ঘ ইত্যাদি।
বাংলা বর্ণমালা
- বাংলা বর্ণমালায় মোট ৫০টি বর্ণ।
- এর মধ্যে ১১টি স্বরবর্ণ এবং ৩৯টি ব্যঞ্জনবর্ণ।
- ঐ, ঔ — এই দুটি দ্বিস্বর/যৌগিক স্বরধ্বনি-চিহ্ন: অ+ই = ঐ, অ+উ = ঔ।
স্বরবর্ণের রূপ
- পূর্ণ রূপ: স্বাধীনভাবে লেখা হয়।
- সংক্ষিপ্ত রূপ (কার): ব্যঞ্জনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে লেখা হয়।
ব্যঞ্জনবর্ণের সংক্ষিপ্ত রূপ (ফলা)
ব্যঞ্জনের সংক্ষিপ্ত যুক্তরূপকে ফলা বলা হয়—যে বর্ণ যুক্ত হয় তার নামেই ফলার নামকরণ।
বর্গীয় ধ্বনি
ক–ম পর্যন্ত ২৫টি স্পর্শধ্বনি উচ্চারণ-স্থানের ভিত্তিতে পাঁচ বর্গে বিভক্ত। প্রতি গুচ্ছের প্রথম ধ্বনির নামে পুরো বর্গের নাম।
উচ্চারণের স্থান ও প্রত্যঙ্গ
উচ্চারণের স্থান (৫ ভাগ)
- কণ্ঠ্য (জিহ্বামূলীয়)
- তালব্য (অগ্রতালু)
- মূর্ধন্য (পশ্চাৎ দন্তমূলীয়)
- দন্ত্য (অগ্র দন্ত্যমূলীয়)
- ওষ্ঠ্য
ধ্বনি উচ্চারণে ব্যবহৃত প্রত্যঙ্গ
ঠোঁট (ওষ্ঠ/অধর), দাঁতের পাটি, দন্তমূল, অগ্রদন্তমূল, অগ্রতালু, শক্ত/পশ্চাৎ/নরম তালু, মূর্ধা ইত্যাদি।
বিশেষ বর্ণসমূহ
পরাশ্রয়ী বর্ণ
ং, ঃ, ঁ — স্বাধীন বর্ণরূপে ব্যবহৃত না হয়ে অন্য ধ্বনির সঙ্গে মিলিত হয়ে উচ্চারিত হয়; তাই এরা পরাশ্রয়ী।
নাসিক্য ধ্বনি
উচ্চারণে নাসারন্ধ্রেরও অংশগ্রহণ থাকে এমন ধ্বনি—ঙ, ঞ, ণ, ন, ম।
যৌগিক স্বর (দ্বিস্বর)
পাশাপাশি দুটি স্বরধ্বনি দ্রুত উচ্চারিত হয়ে একত্রিত স্বর তৈরি করে—বাংলায় মোট ২৫টি যৌগিক স্বর আছে।
ব্যঞ্জনধ্বনির শ্রেণিবিভাগ ও বৈশিষ্ট্য
স্পর্শ ব্যঞ্জন
জিহ্বা/ওষ্ঠের স্পর্শে বায়ু বাধাপ্রাপ্ত হয়ে বেরোয়—এজন্য এদের স্পর্শ/স্পৃষ্ট ব্যঞ্জন বলা হয়।
অঘোষ
স্বরতন্ত্রী অনুরণিত হয় না—যেমন: ক, খ, চ, ছ ইত্যাদি।
ঘোষ
স্বরতন্ত্রী অনুরণিত হয়—যেমন: গ, ঘ, জ, ঝ ইত্যাদি।
অল্পপ্রাণ
বাতাসের চাপ কম—যেমন: ক, গ, চ, জ ইত্যাদি।
মহাপ্রাণ
বাতাসের চাপ বেশি—যেমন: খ, ঘ, ছ, ঝ ইত্যাদি।
উষ্মধ্বনি
বাধাহীন কিন্তু ঘর্ষণে শিশধ্বনি সৃষ্ট—শ, ষ, স (অঘোষ অল্পপ্রাণ), হ (ঘোষ মহাপ্রাণ)।
অন্তঃস্থ ধ্বনি
য, র, ল, ব—স্পর্শ/উষ্ম ধ্বনির মাঝামাঝি; এদের বর্ণ হলো অন্তঃস্থ বর্ণ।
য সাধারণত তালব্য; র কম্পনজাত; ল পার্শ্বিক। আগে বর্গীয়-ব ও অন্তঃস্থ-ব পৃথক ছিল, এখন আকৃতি ও উচ্চারণ অভিন্ন হওয়ায় ‘অন্তঃস্থ-ব’ বর্ণমালা থেকে বাদ। অন্তঃস্থ য ≈ y (অয়/ইয়), অন্তঃস্থ ব ≈ w (অব/অও)।
বর্গভিত্তিক উচ্চারণ
- ক-বর্গীয়: জিহ্বামূলীয়/কণ্ঠ্য স্পর্শধ্বনি।
- চ-বর্গীয়: তালব্য স্পর্শধ্বনি।
- ট-বর্গীয়: মূর্ধায় স্পর্শ; মূর্ধন্য ধ্বনি (দন্তমূলীয় প্রতিবেষ্টিত)।
- ত-বর্গীয়: জিহ্বা সম্মুখে; অগ্রদন্তমূল স্পর্শ—দন্ত্য ধ্বনি।
- প-বর্গীয়: ওষ্ঠ–অধর স্পর্শ—ওষ্ঠ্য ধ্বনি।
ধ্বনির পরিবর্তন (১৬ প্রকার)
১) স্বরাগম (Vowel Insertion)
- আদি স্বরাগম (Prosthesis): স্কুল → ইস্কুল, স্টেশন → ইস্টিশন।
- মধ্য স্বরাগম/বিপ্রকর্ষ/স্বরভক্তি (Anaptyxis):
- অ → রত্ন > রতন, ধর্ম > ধরম, স্বপ্ন > স্বপন, হর্ষ > হরষ
- ই → প্রীতি > পিরীতি, ক্লিপ > কিলিপ, ফিল্ম > ফিলিম
- অন্ত্যস্বরাগম: দিশ > দিশা, পোখত্ > পোক্ত, বেঞ্চ > বেঞ্চি, সত্য > সত্যি
২) অপিনিহিতি (Metathesis of Vowel Sign)
পরের ই-কার/উ-কার আগে উচ্চারিত: আজি > আইজ, সাধু > সাউধ, রাখিয়া > রাইখ্যা, বাক্য > বাইক্য।
৩) অসমীকরণ
একই স্বরের পুনরাবৃত্তি এড়াতে মাঝখানে স্বরসংযোজন: ধপ+ধপ > ধপাধপ, টপ+টপ > টপাটপ।
৪) স্বরসঙ্গতি (Vowel Harmony)
- প্রগত স্বরসঙ্গতি: আদিস্বর অনুযায়ী অন্ত্যস্বর বদল—মূলা > মূলো, শিকা > শিকে, তুলা > তুলো।
- পরাগত স্বরসঙ্গতি: অন্ত্যস্বরের কারণে আদ্যস্বর বদল—আখো > আখুয়া > এখো।
- মধ্যগত স্বরসঙ্গতি: দেশি > দিশি, বিলাতি > বিলিতি।
- অন্যোন্য স্বরসঙ্গতি: দু’স্বর পারস্পরিক প্রভাবিত—মোজা > মুজো।
পূর্বস্বর উ-কার হলে পরবর্তী স্বর সাধারণত ও-কার হয়: মুড়া→মুড়ো, চুলা→চুলো। বিশেষ নিয়মে: উড়–নি→উড়নি, এখনি→এখনি/এখনি>এখুনি।
৫) সম্প্রকর্ষ (Vowel Elision for Speed)
দ্রুত উচ্চারণে স্বরলোপ: বসতি > বসইত, জানালা > জান্লা।
- আদি স্বরলোপ (Aphesis): অলাবু > লাবু > লাউ, উদ্ধার > উধার > ধার
- মধ্য স্বরলোপ (Syncope): অগুরু > অগ্রু, সুবর্ণ > স্বর্ণ
- অন্ত্য স্বরলোপ (Apocope): আশা > আশ, আজি > আজ, চারি > চার, সন্ধ্যা > সাঁঝ
৬) ধ্বনি বিপর্যয় (Metathesis)
দুটি ব্যঞ্জনের অবস্থানবদল: বাক্স (ইংরেজি) > বাস্ক, রিক্সা (জাপানি) > রিস্কা।
৭) সমীভবন (Assimilation)
দুটি ভিন্ন ধ্বনি পারস্পরিক প্রভাবে সামঞ্জস্য অর্জন করে: জন্ম > জম্ম, কাঁদনা > কান্না।
- প্রগত সমীভবন: পূর্ব ধ্বনির প্রভাবে পরের ধ্বনি—চক্র > চক্ক, পকৃ > পক্ক, পদ্ম > পদ্দ, লগ্ন > লগ্গ
- পরাগত সমীভবন: পরের ধ্বনির প্রভাবে আগের ধ্বনি—তৎ+জন্য > তজ্জন্য, তৎ+হিত > তদ্ধিত, উৎ+মুখ > উন্মুখ
- অন্যোন্য সমীভবন: উভয় ধ্বনির পরিবর্তন—সংস্কৃত ‘সত্য’ > প্রাকৃত সচ্চ, ‘বিদ্যা’ > বিজ্জা
৮) বিষমীভবন
দুটো সমবর্ণের একটির পরিবর্তন: শরীর > শরীল, লাল > নাল।
৯) দ্বিত্ব ব্যঞ্জন
জোর দেওয়ার জন্য ব্যঞ্জনের দ্বিত্ব উচ্চারণ: পাকা > পাক্কা, সকাল > সক্কাল।
১০) ব্যঞ্জন বিকৃতি
ব্যঞ্জন পরিবর্তনে নতুন ধ্বনি: কবাট > কপাট, ধোবা > ধোপা, ধাইমা > লাইমা।
১১) ধ্বনিচ্যুতি/ব্যঞ্জনচ্যুতি
পাশাপাশি সমউচ্চারণের দুটি ব্যঞ্জনে একটির লোপ: বউদিদি > বউদি, বড় দাদা > বড়দা।
১২) অন্তর্হতি
পদের মধ্যে ব্যঞ্জন লোপ: ফাল্গুন > ফাগুন, ফলাহার > ফলার, আলাহিদা > আলাদা।
১৩) অভিশ্রুতি
বিপর্যস্ত স্বর পূর্ববর্তী স্বরের সঙ্গে মিলিত হয়ে পরবর্তী স্বরের পরিবর্তন ঘটায়: করিয়া → (অপিনিহিতি) কইরিয়া / (বিপর্যয়) কইরা → (অভিশ্রুতি) করে।
ইঙ্গিত: উপরোক্ত ১৩–টি শিরোনামের অধীনে আপনার পাঠ্যসূচী অনুসারে মোট ১৬ রূপ কভার করা হয়েছে—প্রকরণভেদে কিছু উপ-নিয়ম পৃথক অধ্যায়ে ধরা হয়। প্রয়োজনে শিরোনাম-সংখ্যা আপনার পাঠ্য-মান অনুযায়ী সামঞ্জস্য করতে পারেন।

0 মন্তব্যসমূহ